হাসিনা-আওয়ামী সরকার ও ভারতের আদানি গ্রুপ
দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে কী সখ্যতা!
হাসিনা-আওয়ামী সরকার ও ভারতের আদানি গ্রুপ
দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে কী সখ্যতা!
আন্দোলন প্রতিবেদন
শুক্রবার, ১২ মে ২০২৩ | অনলাইন সংস্করণ
গত ২৪ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা হিন্ডেনবার্গ রিসার্চের প্রতিবেদনই বিশ্বজুড়ে আলোচিত করেছিল ভারতের গৌতম আদানিকে। হিডেনবার্গে প্রতিবেদন বলেছে, স্বল্পসময়ে আদানি গ্রুপের অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির নেপথ্যে কারণ ছিল শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারিসহ নানা ধরনের প্রতারণা। এই প্রতারণা-জালিয়াতি করেই গৌতম আদানি বিশ্বের ধনীদের তৃতীয় স্থান দখল করেছিল। তখন তার (২০২২ সালে) সম্পদের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৮৫০ কোটি ডলার (প্রায় ১০ লক্ষ কোটি টাকা– বাংলাদেশের বাৎসরিক বাজেটের দ্বিগুণ)। উল্লেখ্য ২০২০ সালে তার সম্পদের মূল্য ছিল মাত্র ৮৯০ কোটি ডলার। করোনা মহামারিতে বিশ্বের শত কোটিপতির মতো গৌতম আদানির সম্পদও ফুলেফেঁপে ওঠে।
গুজরাটের কসাই নামে খ্যাত নরেন্দ্র মোদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্রে গৌতম আদানি ও মুকেশ আম্বানিদের মতো বড় ধনীদের বিরাট ভূমিকা ছিল। প্রতিদানে ক্ষমতায় এসে নরেন্দ্র মোদি সরকার এই সব বড় ধনীদের বিভিন্নভাবে দেশে-বিদেশে অর্থ লুটপাটে সহায়তা করে আসছে। তারই অংশ হিসেবে নরেন্দ্র মোদি ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য হাসিনা সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আদানি পাওয়ার লিমিটেড ২৫ বছর মেয়াদি অসম চুক্তি করে। সেই চুক্তি অনুযায়ী ভারতের ঝাড়খণ্ডে ১৬০০ মেগওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
এই আদানি গ্রুপ ৯০'র দশকের শুরুতে বাংলাদেশে ভোজ্যতেল বিক্রি দিয়ে এদেশে তাদের ব্যবসা শুরু করেছিল। সিঙ্গাপুরের উইলমার ইন্টারন্যাশনাল ও ভারতের আদানি গ্রুপের যৌথ কোম্পানি বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড (বিইওএল) ১৯৯৩ সাল থেকে দেশে ব্যবসা করছে। কোম্পানিটি রূপচাঁদা, ফরচুন, কিংস, মিজান ও ভিওলা ব্র্যান্ড নামে বাজারে ভোজ্যতেল বিক্রি করছে। তারপর তারা বিনিয়োগ বাড়িয়ে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যন্ত ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে। শুরুটা নিরীহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে হলেও, বিজেপি সরকারের ক্ষমতা বলে এবং দালাল হাসিনা সরকারের সহযোগিতায় বিগত মাত্র আট বছরে বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বহুগুণ বাড়িয়েছে। আদানি উইলমারের ২০২১-২২ বছরের বার্ষিক হিসাব অনুসারে, বিইওএল বাংলাদেশে মোট ২ হাজার ১৫৫ কোটি টাকার ভোজ্যতেল বিক্রি (টার্নওভার) করেছে।
২০১৭ সালে কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত পুরো বিদ্যুৎ আগামী ২৫ বছরব্যাপী বাংলাদেশ কিনবে– এমন দেশ-বিরোধী চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তিতে বিদ্যুতের দাম, বিদ্যুৎ ক্রয়ে বাধ্যবাধকতা, ক্যাপাসিটি চার্জ, বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আদানির সাথে গোপন চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, যা রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি থেকেও ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অথচ এই বিদ্যুতের কোনো প্রয়োজন ছিল না। দেশেই এখন বহু বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসে বসে টাকা খাচ্ছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত শেখ মুজিব শিল্পনগরে অবস্থিত ভারতীয় অর্থনৈতিক অ লের (আইইজেড) উন্নয়নকারী ও পরিচালক (ডেভেলপার) হিসেবে বিনিয়োগ করবে ভারতের আদানি গ্রুপ। ডেভেলপার হিসেবে আদানি-বাংলাদেশ পোর্টস লিমিটেডের কাজ হবে অর্থনৈতিক অ লটি পরিচালনা ও প্লট বরাদ্দ দেওয়া ইত্যাদি। এর বাইরে এ শিল্পনগরে ভোজ্যতেলসহ কৃষি প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য তৈরির একটি শিল্পপার্ক করার পরিকল্পনা রয়েছে আদানি গ্রুপের। এ জন্য বছর তিনেক আগে শিল্পনগরের মধ্যেই পৃথক ১০০ একর জায়গা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আদানি গ্রুপের একজন মুখপাত্র মিডিয়াকে জানান, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, খাদ্যপণ্যসহ একাধিক খাতে আদানি গ্রুপের বিনিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ রয়েছে দ্রুত বিক্রি হয় এমন খাদ্যপণ্য (এফএমসিজি) ও বিদ্যুৎ খাতে। এ ছাড়াও ২০০ মেগওয়াটের একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রের জন্য বিনিয়োগ প্রস্তাব এবং সরকারি প্রকল্পের জন্য বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও বিতরণ খাতে বিনিয়োগ আগ্রহ। পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে কয়লা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) তরলীকৃত প্রেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) খাতসহ আরো বহুবিধ ক্ষেত্রে বিনিয়োগের আগ্রহ রয়েছে বলে জানায়। তারা আরো জানায় মেধাবী ও বৃহৎ জনশক্তির পাশাপাশি বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ রয়েছে। এজন্য প্রতিবেশী হিসেবে আদানি গোষ্ঠী বাংলাদেশকে বিপুল সুযোগ ও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় জায়গা হিসেবে দেখে। পাশাপাশি আদানি গ্রুপের পরিবহণ পরিষেবা আদানি পোর্টস অ্যান্ড স্পেশাল ইকোনমিক জোন চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে একটি পরিকল্পিত ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে টার্মিনালের উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ ও চুক্তির বিষয়টি মূল্যায়ন করছে। এ ছাড়া আদানি গ্রুপ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের ব্যবসার সুযোগও খুঁজে দেখছে তারা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আদানি গ্রুপের চেয়ারপারসন গৌতম আদানির বৈঠক হয়েছে।
ভারতের দালাল ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকার ভারতের আদানিসহ বড় বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে দেশের জন-জল-জমির উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিয়েছে। দেশের বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্বেও মোদিকে খুশি করতে আদানি গ্রুপের সাথে এক অসম চুক্তি করেছে আওয়ামী সরকার। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সমস্ত ক্ষতি ও ঝুঁকির ভার বাংলাদেশ বহন করবে, আর সমস্ত লাভের ভাগ আদানি গ্রুপ নিয়ে যাবে। চুক্তির কোনো শর্ত পরবর্তীতে আদানি গ্রুপ না মানলেও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ কেনা থেকে সরে আসতে পারবে না। বেশি দামে কয়লা কিনতে হলে বাংলাদেশকে তা বহন করতে হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাঁচামালের যেকোনো প্রকার ঝুঁকি আদানি বহন করবে না। আদানি পাওয়ার থেকে কোনো কারণে বিদ্যুৎ না কিনলেও ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে বছরে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলারসহ জরিমানা ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু একই কারণে আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারলেও বাংলাদেশকে তার জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে না।
আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ না নিতে দেশের বিশেষজ্ঞদের তীব্র বিরোধিতা সত্বেও গণবিরোধী আওয়ামী সরকার আদানি গ্রুপের বিপুল লুটপাট মুনাফা অর্জনে বাংলাদেশকে একটি মৃগয়াক্ষেত্রে পরিণত করেছে। এতে বাংলাদেশের জ্বালানি-নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার হবে।
একই কাজ ভারতে হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার করছে। ভারতের শিল্প ক্ষেত্র, শ্রমবাজার, পুঁজিবাজারে আদানি গ্রুপের একচ্ছত্র অধিপত্য কায়েমের সুযোগ করে দিয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থ লগ্নি করেছে আদানি গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। গত কয়েক বছরের মধ্যে ভারতের অর্থনৈতিক ‘উন্নয়নের’ ধারাও আদানি শিল্পগোষ্ঠীর প্রসার সমার্থক করে তুলেছে। যেসব বীমা কর্পোরেশন গুলোতে ভারতের প্রায় সব পরিবারের হিস্যা আছে সেসব বীমা কর্পোরেশনগুলোই আদানির কোম্পানিতে ব্যাপক পরিমাণ অর্থ লগ্নি করা আছে। দেশে কোটি কোটি আমজনতার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এমনভাবে আদানি গোষ্ঠীর ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যে আদানির কোনও বিপর্যয় রাষ্ট্র হিসেবে ভারত সহ্যই করতে পারবে না।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের দালাল হাসিনা-আওয়ামী সরকারের সাথে ভারত-বাংলাদেশের অতি ধনী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর এই আঁতাতই আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রেখেছে। একই শর্তে সাম্রাজ্যবাদী প্রভুরাও সেই ফ্যাসিবাদকে মদদ দিচ্ছে। তাই, আমাদের মরিয়া হয়ে সাম্রাজ্যবাদ-ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, দালাল শাসকশ্রেণি ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের শাসনের অবসান ঘটাতে হবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
হাসিনা-আওয়ামী সরকার ও ভারতের আদানি গ্রুপ
দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে কী সখ্যতা!
গত ২৪ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা হিন্ডেনবার্গ রিসার্চের প্রতিবেদনই বিশ্বজুড়ে আলোচিত করেছিল ভারতের গৌতম আদানিকে। হিডেনবার্গে প্রতিবেদন বলেছে, স্বল্পসময়ে আদানি গ্রুপের অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির নেপথ্যে কারণ ছিল শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারিসহ নানা ধরনের প্রতারণা। এই প্রতারণা-জালিয়াতি করেই গৌতম আদানি বিশ্বের ধনীদের তৃতীয় স্থান দখল করেছিল। তখন তার (২০২২ সালে) সম্পদের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৮৫০ কোটি ডলার (প্রায় ১০ লক্ষ কোটি টাকা– বাংলাদেশের বাৎসরিক বাজেটের দ্বিগুণ)। উল্লেখ্য ২০২০ সালে তার সম্পদের মূল্য ছিল মাত্র ৮৯০ কোটি ডলার। করোনা মহামারিতে বিশ্বের শত কোটিপতির মতো গৌতম আদানির সম্পদও ফুলেফেঁপে ওঠে।
গুজরাটের কসাই নামে খ্যাত নরেন্দ্র মোদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্রে গৌতম আদানি ও মুকেশ আম্বানিদের মতো বড় ধনীদের বিরাট ভূমিকা ছিল। প্রতিদানে ক্ষমতায় এসে নরেন্দ্র মোদি সরকার এই সব বড় ধনীদের বিভিন্নভাবে দেশে-বিদেশে অর্থ লুটপাটে সহায়তা করে আসছে। তারই অংশ হিসেবে নরেন্দ্র মোদি ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য হাসিনা সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আদানি পাওয়ার লিমিটেড ২৫ বছর মেয়াদি অসম চুক্তি করে। সেই চুক্তি অনুযায়ী ভারতের ঝাড়খণ্ডে ১৬০০ মেগওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
এই আদানি গ্রুপ ৯০'র দশকের শুরুতে বাংলাদেশে ভোজ্যতেল বিক্রি দিয়ে এদেশে তাদের ব্যবসা শুরু করেছিল। সিঙ্গাপুরের উইলমার ইন্টারন্যাশনাল ও ভারতের আদানি গ্রুপের যৌথ কোম্পানি বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড (বিইওএল) ১৯৯৩ সাল থেকে দেশে ব্যবসা করছে। কোম্পানিটি রূপচাঁদা, ফরচুন, কিংস, মিজান ও ভিওলা ব্র্যান্ড নামে বাজারে ভোজ্যতেল বিক্রি করছে। তারপর তারা বিনিয়োগ বাড়িয়ে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যন্ত ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে। শুরুটা নিরীহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে হলেও, বিজেপি সরকারের ক্ষমতা বলে এবং দালাল হাসিনা সরকারের সহযোগিতায় বিগত মাত্র আট বছরে বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বহুগুণ বাড়িয়েছে। আদানি উইলমারের ২০২১-২২ বছরের বার্ষিক হিসাব অনুসারে, বিইওএল বাংলাদেশে মোট ২ হাজার ১৫৫ কোটি টাকার ভোজ্যতেল বিক্রি (টার্নওভার) করেছে।
২০১৭ সালে কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত পুরো বিদ্যুৎ আগামী ২৫ বছরব্যাপী বাংলাদেশ কিনবে– এমন দেশ-বিরোধী চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তিতে বিদ্যুতের দাম, বিদ্যুৎ ক্রয়ে বাধ্যবাধকতা, ক্যাপাসিটি চার্জ, বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আদানির সাথে গোপন চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, যা রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি থেকেও ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অথচ এই বিদ্যুতের কোনো প্রয়োজন ছিল না। দেশেই এখন বহু বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসে বসে টাকা খাচ্ছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত শেখ মুজিব শিল্পনগরে অবস্থিত ভারতীয় অর্থনৈতিক অ লের (আইইজেড) উন্নয়নকারী ও পরিচালক (ডেভেলপার) হিসেবে বিনিয়োগ করবে ভারতের আদানি গ্রুপ। ডেভেলপার হিসেবে আদানি-বাংলাদেশ পোর্টস লিমিটেডের কাজ হবে অর্থনৈতিক অ লটি পরিচালনা ও প্লট বরাদ্দ দেওয়া ইত্যাদি। এর বাইরে এ শিল্পনগরে ভোজ্যতেলসহ কৃষি প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য তৈরির একটি শিল্পপার্ক করার পরিকল্পনা রয়েছে আদানি গ্রুপের। এ জন্য বছর তিনেক আগে শিল্পনগরের মধ্যেই পৃথক ১০০ একর জায়গা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আদানি গ্রুপের একজন মুখপাত্র মিডিয়াকে জানান, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, খাদ্যপণ্যসহ একাধিক খাতে আদানি গ্রুপের বিনিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ রয়েছে দ্রুত বিক্রি হয় এমন খাদ্যপণ্য (এফএমসিজি) ও বিদ্যুৎ খাতে। এ ছাড়াও ২০০ মেগওয়াটের একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রের জন্য বিনিয়োগ প্রস্তাব এবং সরকারি প্রকল্পের জন্য বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও বিতরণ খাতে বিনিয়োগ আগ্রহ। পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে কয়লা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) তরলীকৃত প্রেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) খাতসহ আরো বহুবিধ ক্ষেত্রে বিনিয়োগের আগ্রহ রয়েছে বলে জানায়। তারা আরো জানায় মেধাবী ও বৃহৎ জনশক্তির পাশাপাশি বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ রয়েছে। এজন্য প্রতিবেশী হিসেবে আদানি গোষ্ঠী বাংলাদেশকে বিপুল সুযোগ ও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় জায়গা হিসেবে দেখে। পাশাপাশি আদানি গ্রুপের পরিবহণ পরিষেবা আদানি পোর্টস অ্যান্ড স্পেশাল ইকোনমিক জোন চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে একটি পরিকল্পিত ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে টার্মিনালের উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ ও চুক্তির বিষয়টি মূল্যায়ন করছে। এ ছাড়া আদানি গ্রুপ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের ব্যবসার সুযোগও খুঁজে দেখছে তারা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আদানি গ্রুপের চেয়ারপারসন গৌতম আদানির বৈঠক হয়েছে।
ভারতের দালাল ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকার ভারতের আদানিসহ বড় বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে দেশের জন-জল-জমির উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিয়েছে। দেশের বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্বেও মোদিকে খুশি করতে আদানি গ্রুপের সাথে এক অসম চুক্তি করেছে আওয়ামী সরকার। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সমস্ত ক্ষতি ও ঝুঁকির ভার বাংলাদেশ বহন করবে, আর সমস্ত লাভের ভাগ আদানি গ্রুপ নিয়ে যাবে। চুক্তির কোনো শর্ত পরবর্তীতে আদানি গ্রুপ না মানলেও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ কেনা থেকে সরে আসতে পারবে না। বেশি দামে কয়লা কিনতে হলে বাংলাদেশকে তা বহন করতে হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাঁচামালের যেকোনো প্রকার ঝুঁকি আদানি বহন করবে না। আদানি পাওয়ার থেকে কোনো কারণে বিদ্যুৎ না কিনলেও ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে বছরে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলারসহ জরিমানা ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু একই কারণে আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারলেও বাংলাদেশকে তার জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে না।
আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ না নিতে দেশের বিশেষজ্ঞদের তীব্র বিরোধিতা সত্বেও গণবিরোধী আওয়ামী সরকার আদানি গ্রুপের বিপুল লুটপাট মুনাফা অর্জনে বাংলাদেশকে একটি মৃগয়াক্ষেত্রে পরিণত করেছে। এতে বাংলাদেশের জ্বালানি-নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার হবে।
একই কাজ ভারতে হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার করছে। ভারতের শিল্প ক্ষেত্র, শ্রমবাজার, পুঁজিবাজারে আদানি গ্রুপের একচ্ছত্র অধিপত্য কায়েমের সুযোগ করে দিয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থ লগ্নি করেছে আদানি গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। গত কয়েক বছরের মধ্যে ভারতের অর্থনৈতিক ‘উন্নয়নের’ ধারাও আদানি শিল্পগোষ্ঠীর প্রসার সমার্থক করে তুলেছে। যেসব বীমা কর্পোরেশন গুলোতে ভারতের প্রায় সব পরিবারের হিস্যা আছে সেসব বীমা কর্পোরেশনগুলোই আদানির কোম্পানিতে ব্যাপক পরিমাণ অর্থ লগ্নি করা আছে। দেশে কোটি কোটি আমজনতার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এমনভাবে আদানি গোষ্ঠীর ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যে আদানির কোনও বিপর্যয় রাষ্ট্র হিসেবে ভারত সহ্যই করতে পারবে না।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের দালাল হাসিনা-আওয়ামী সরকারের সাথে ভারত-বাংলাদেশের অতি ধনী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর এই আঁতাতই আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রেখেছে। একই শর্তে সাম্রাজ্যবাদী প্রভুরাও সেই ফ্যাসিবাদকে মদদ দিচ্ছে। তাই, আমাদের মরিয়া হয়ে সাম্রাজ্যবাদ-ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, দালাল শাসকশ্রেণি ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের শাসনের অবসান ঘটাতে হবে।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র